খবর আনন্দবাজার

একই সঙ্গে ৪ রকমের স্বাদ নিতে পারে ইঁদুর!

14

খাবারের স্বাদ বুঝে নিতে ইঁদুরের জুড়ি মেলা ভার। আমাদের জিভের চেয়ে কোনও অংশেই কম যায় না ইঁদুরের স্বাদ-বোধ। বরং আমাদের জিভের পক্ষেও যা অসম্ভব, ইঁদুর সেটাও পারে। একই সঙ্গে টের পায় চার রকমের স্বাদ। ইঁদুর এমনই রসিক!

কোন খাবারটা ঝাল, কোনটা তেতো বা মিষ্টি আর কোনটাই বা টক, তা খুব ভালোই বুঝতে পারে ইঁদুর। শুধু নোনতা স্বাদটাই তারা পায় না। তাই আমাদের রান্নাঘরে রাখা নুনের পাত্রটি যে অন্তত ইঁদুরের হামলা থেকে নিরাপদ, এ নিয়ে আর কোনও সন্দেহই থাকল না। এক আবিষ্কারে উঠে আসল এ চিত্র।

আমেরিকার ইন্ডিয়ানাপোলিসে ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব মেডিসিনের নিউরোফিজিওলজির অধ্যাপক দেবার্ঘ দত্ত বণিক ও তার সহযোগীরা ইঁদুরের স্বাদকোরকে (‘টেস্ট বাড্স’) নতুন কয়েকটি কোষের হদিশ পেয়েছেন। তারা দেখেছেন, এই কোষগুলিই ইঁদুরকে পাঁচ রকম স্বাদের মধ্যে চার রকম স্বাদই বুঝতে সাহায্য করে। ইঁদুরকে করে তোলে যথেষ্টই খাদ্যরসিক। স্বাদের বাছবিচারে রীতিমতো দক্ষ। তাদের সাড়াজাগানো গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান-জার্নাল ‘প্লস জেনেটিক্স’-এ। গত ১৩ আগস্ট গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়।

দেবার্ঘদের গবেষণার আরও অভিনবত্ব, তারাই প্রথম দেখিয়েছেন, আমাদের স্বাদকোরকে থাকা কোষগুলির চেয়েও বেশি পারদর্শী ইঁদুরের জিভে থাকা সদ্য আবিষ্কৃত কোষগুলি। আমাদের স্বাদকোরকে থাকা কোনও কোষ বড়জোর এক বা দু’রকমের স্বাদ টের পায়। মিস্টি বা সুক্রালোজ অথবা তেতোর (‘ক্যাফিন’)। অন্য কোষ টের পায় বাকি তিনটি স্বাদের মধ্যে বড়জোর একটি বা দু’টি। কিন্তু আমাদের স্বাদ কোরকের কোনও কোষই এক সঙ্গে চার বা পাঁচ রকমের স্বাদ টের পায় না। ইঁদুরের স্বাদকোরকের সদ্য আবিষ্কৃত কোষগুলি কিন্তু একই সঙ্গে চার রকমের স্বাদ টের পায়।

কীভাবে হদিশ মিলল নতুন কোষগুলির?

দেবার্ঘ জানান, ইঁদুরের খাবারদাবারের স্বাদ বুঝতে পারে এটা জানা ছিল। ওদের স্বাদকোরকের কোন কোন কোষ সেই স্বাদগুলি টের পেতে সাহায্য করে, সেটাও জীববিজ্ঞানীদের মোটামুটি জানা ছিল। ফলে ইঁদুরের স্বাদকোরকের সেই কোষগুলিকে পুরোপুরি বের করে নেওয়া হয়েছিল। আর তার পর ইঁদুরগুলিকে নানা রকম স্বাদের নানা ধরনের রাসায়নিক খেতে দেওয়া হয়েছিল। যাতে বোঝা যায়, তার পরেও খাবারদাবারের স্বাদ টের পাচ্ছে কি না ইঁদুর।

দেবার্ঘের কথায়, ‘আমরা অবাক হয়ে দেখেছি তার পরেও ইঁদুর খাবারদাবারের স্বাদ খুব ভাল ভাবেই টের পাচ্ছে। সেই মতো বেছে বেছে খাবারও খাচ্ছে। আর সেটা সম্ভব হচ্ছে ইঁদুরের স্বাদকোরকে থাকা সদ্য আবিষ্কৃত কোষগুলির জন্যই। দেখেছি, ওই কোষগুলি একই সঙ্গে চার রকম স্বাদ টের পেতেই সাহায্য করছে ইঁদুরকে। যা আমাদের ক্ষেত্রেও কখনও ঘটে না। এটা রীতিমতো বিস্ময়কর।’’

বিকল্প পথেও স্বাদ বোঝার ক্ষমতা রাখে ইঁদুর!

কিন্তু একা স্বাদকোরকের পক্ষে তো আর খাবারদাবারের নানা রকমের স্বাদ বোঝা সম্ভব নয়। তার জন্য স্বাদকোরকের কোষগুলিকে বিশেষ বিশেষ বার্তা (‘মেসেজ’) পাঠাতে হয় ব্রেন বা মস্তিষ্ককে। সেই নানা রকম স্বাদ পাওয়ার জন্য নানা ধরনের বার্তা স্বাদকোরকের কোষগুলি পাঠায় বিশেষ বিশেষ প্রোটিনের মাধ্যমে।

দেবার্ঘ বলছেন, ‘‘আমরা দেখেছি, ওই প্রোটিনগুলি না থাকলেও ইঁদুরের স্বাদকোরকের ওই কোষগুলি ব্রেনকে বার্তা না পাঠিয়েও নানা রকমের স্বাদ অনুভব করতে পারছে। তার মানে, নানা রকমের স্বাদ বোঝার জন্য ইঁদুরের স্বাদকোরকের কোষগুলির বিকল্প ব্যবস্থা থাকে। যা মানুষেরও নেই। এর ফলে, স্বাদ অনুভবের যে প্রক্রিয়াটা আমাদের ধারণায় ছিল এত দিন, তা বদলে যেতে পারে বলে মনে করছি।’’

হদিস দেখাতে পারে মানুষকেও

গবেষকরা জানাচ্ছেন, কেমোথেরাপির মতো নানা রকমের চিকিৎসা ও বিভিন্ন ওষুধের দীর্ঘদিনের প্রয়োগে আমাদের অনেকেরই খাবারদাবারের স্বাদ নিতে পারার ক্ষমতা হারিয়ে যায়।

দেবার্ঘের দাবি, ‘এবার হয়তো এই আবিষ্কারের সূত্রে এমন কোনও নতুন পথের দিশা মিলবে যাতে স্বাদ-ব‌োধ হারিয়ে ফেলা মানুষেরও স্বাদের অনুভূতি ফিরিয়ে দেওয়া যেতে পারে। দৃষ্টিশক্তি বা শ্রবণশক্তি হারিয়ে ফেললে আমরা যেমন বিকল্প ব্যবস্থা নিতে পারি।’’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here