helth

শরীর ভালো রাখতে ফাস্টিং যেভাবে কাজ করে

আগের সংবাদ
ds

মুক্ত আকাশে দুই ঈগলের তুমুল লড়াই

পরের সংবাদ

জাতীয় গ্রিড বিপর্যয় এবং আমরা…

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট ঢাকা

প্রকাশিত: ২০২২-১০-০৭ , ৮:৩০ অপরাহ্ণ
আপডেট: ২০২২-১০-০৭ , ৯:০৩ অপরাহ্ণ
led

দুপুরের আগে আগে কম্পিউটারে বসে ফেসবুকে বন্ধুদের সাথে কথোপকথন করছি। এমন সময়ে কারেন্ট চলে গেল। শোনা গেলো ঘোড়াশালে জাতীয় গ্রিড বিপর্যয় ঘটেছে। প্রায় সারাদেশেই বিদ্যুৎ নেই! কখন, কোনদিন আসবে কেউই জানে না!

আমি প্রাথমিক পর্যায়ে বিষয়টাকে সিরিয়াসলি নেইনি, বরং খুশি হয়েছি একারণে যে, আজ আর খামাখা কষ্ট করে অফিস করতে হবে না। বদ্ধ ঘরের ভেতরে গরমে সিদ্ধ হতে কার ভাল লাগে? অফিস থেকে বেরিয়ে মনের আনন্দে শহরময় ঘুরে বেড়ালাম। বিকেল ৪ টার দিকে ড্রাইভার বলল, স্যার, বাসায় রিং করেন। আমি অবাক হয়ে বললাম, কেন?

বলল, স্যার, পানি জমিয়ে না রাখলে ভীষণ বিপদে পড়ে যাবেন! আমি আমার ছোট ভাইকে দিয়ে ৪ বালতি পানি জমিয়ে রেখেছি। ড্রাইভারের কণ্ঠস্বরের ভিতরে একটা খুব বড় ধরনের বিপদের অশনিসংকেত প্রতিফলিত হলো।

বিকেল ৫ টার দিকে বাসায় ফিরলাম। ঢাকা সেনানিবাসের রেসিডেনশিয়াল এরিয়া। ৯ নম্বর রোডের ভেতরে দেখলাম বৃন্দাবনের গোয়ালিনীদের মতো শত শত কিশোরী, যুবতীরা এলুমিনিয়ামের কলসি কাঁখে ছুটোছুটি করছে! রাস্তার ওপারে কাটা তারের বাইরে ভাষানটেক বস্তি। বেশ কয়েকজন বস্তির কিশোরদেরও দেখলাম বালতি নিয়ে ছুটোছুটি করতে। সবাই পানি সংগ্রহ করছে; যে যেখান থেকে পারে। ভাবলাম, সত্যিই কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।

স্ত্রীকে গ্রিড বিপর্যয়ের কথা জানাতেই সে অস্থিরভাবে বলল, এতক্ষণ বলোনি কেন? আমিতো ভেবেছি এমনিতেই কারেন্ট চলে গেছে। কিছুক্ষন পর আবার ফেরত আসবে! তাড়াতাড়ি করে বালতিতে পানি ভরে রাখো। আমি অবাক হয়ে গেলাম, বালতিতে পানি ভরে রাখতে হবে কেন? বাসার ওপরে যে পানির ট্যাঙ্ক আছে তাতে যথেষ্ট পরিমানে পানি আছে, তা দিয়েই এই বাসার সকল অধিবাসীদের অন্ততঃ দু’ দিন চলে যাবে। এর ভিতরে নিশ্চয়ই গ্রিড বিপর্যয় কেটে যাবে। স্ত্রীর কথামতো বালতিতে পানি ভরার জন্য ট্যাব ছাড়তেই দেখি অবাক কাণ্ড। ট্যাব দিয়ে আকরিকযুক্ত ময়লা কর্দমাক্ত পানি বেরোচ্ছে। বাসার অন্য সকল ফ্ল্যাটের অধিবাসীরা ট্যাংকের সব পানি ইতিমধ্যেই তাদের বালতি, কলসি অথবা অন্য কোন পাত্রে ভরে ফেলেছে!

স্ত্রীর নির্দেশ মত খাবার পানি সংগ্রহের জন্য বাসা থেকে বের হলাম! সন্ধে হয়ে এসেছে! ব্রডওয়ের সিএসডি তালাবন্ধ। এখানে ডিজিটাল কাউনটারের মাধ্যমে কেনা-বেচা হয়! অ্যানালগ পদ্ধতিতে বেচা কেনার পদ্ধতি উঠে যাওয়ায় এরা কিছুই বেচাকেনা করতে পারছেনা! অথচ, সিএসডি’র ভিতরে হাজার হাজার পানির বোতল থরে থরে সাজানো।বাধ্য হয়ে ৯ নম্বর রোডের দোকানগুলোর দিকে পা বাড়ালাম। অনেক কষ্টে দুই বোতল পানি কিনে দোকানের বাইরে আসতেই দেখি রাস্তায় মোমবাতি আর দেশলাই বিক্রির জন্য পসরা সাজিয়ে বসেছে একজন। ৩ গুন, ৪ গুন দামে বিক্রি করছে ওগুলো! প্রতিজনে এক ডজন, দু’ ডজন করে কিনে নিয়ে যাচ্ছে! সবাই এক মহা প্রলয়ের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে!

একটু এগিয়ে পেট্রোল পাম্পের দিকে এসে দেখি ভীষণ ভিড়। গাড়ির কারনে রাস্তায় চলাফেরার উপায় নেই। বিদ্যুৎ না আসলে কাল থেকে গ্যাসও পাওয়া যাবে না।

সন্ধ্যার পর। হেমন্তের চাঁদ উঠেছে। আমার বাসার সামনের পুকুরের পাড়ে ছোট ছোট দলে বিভক্ত শত শত মানুষের ভিড়। কেউ কেউ তাদের প্রিয়জনদের সাথে মোবাইলে তাদের শেষ প্রয়োজনীয় কথাগুলো সেরে নিচ্ছে। মোবাইলের চার্জ শেষ হয়ে গেলে তাদের আর হয়ত কোনদিন তাদের সাথে কথা হবে না। অনেকেই রাজনৈতিক আলাপ আলোচনায় মগ্ন। একজন বলল, এই সরকারের আমলে আর বিদ্যুৎ আসবে না।

আমি মানুষের ভিড় অতিক্রম করে সেনানিবাসের প্রধান রাস্তার ফুটপাথ দিয়ে হাঁটতে থাকি। রাস্তা দিয়ে অন্ধকারের বুক চিরে ভূতুড়ে আলো ছড়িয়ে গাড়িগুলো যাওয়া আসা করছে। কাল অথবা পরশু থেকে গ্যাসের অভাবে হয়ত কোন গাড়িই চলবে না। এইচ ডি ওয়েলস এর ‘টাইম মেশিন’ গল্পটার কথা মনে পড়ে গেল। লেখক তার টাইম মেশিনে করে ভবিষ্যৎ পৃথিবী‘র এক বিবর্ণ সময়ে এসে পড়েছেন, যেখানে মানুষ তার প্রাগৈতিহাসিক আদিমতায় ফিরে গেছে!

পুরনো কচুক্ষেত বাজারের নিকট সেনানিবাসের ঝকঝকে ফুটপাতের ওপর একজন ভিক্ষুক ছেড়া জামা পরে শুয়ে আছে। পাশে ভিক্ষার বাটি। অন্য কারো মতো সে পানি বা খাবার কিছুই সংগ্রহ করেনি। হেমন্তের চাঁদের নরম আলোয় আমি খেয়াল করে দেখলাম, আমাদের সবার চেয়ে তার মুখের অবয়ব এবং দৃষ্টি অনেক বেশি মানবিক!
মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ

নোট: ২০১৪ সালে একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে লেখা

মন্তব্য করুন

যে মন্তব্যগুলো খবরের বিষয়বস্তুর সাথে মিল আছে এবং আপত্তিজনক হবে না সেই মন্তব্যগুলোই দেখানো হবে। প্রকাশিত মন্তগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত। পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য AZnewsbd কোন দায়ভার গ্রহণ করবে না।

জনপ্রিয়