বাংলাদেশ: শনিবার ১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ
৩রা আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ১১ই সফর, ১৪৪৩ হিজরি

  বাংলাদেশ: শনিবার ১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ১১ই সফর, ১৪৪৩ হিজরি  

শেষ আপডেটঃ ১১:৩০ পিএম

বিশ্বায়ন কি? জানুন বিশ্বায়নের ইতিহাস

বিশ্বায়ন (globalization) এমন একটি আন্তর্জাতিক অবস্থা যাতে পৃথিবীর বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থা দৈশিক গণ্ডি ছাড়িয়ে বহিঃদেশীয় পরিসরে ব্যাপ্তি লাভ করেছে। এর ফলে সারা বিশ্ব একটি পরিব্যাপ্ত সমাজে পরিণত হয়েছে এবং অভিন্ন বিনিয়োগ,কর্মসংস্থান,উৎপাদন ও বিপণন প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন দেশ যুগপৎ অংশগ্রহণ করছে। এটি পারস্পরিক ক্রিয়া এবং আন্তঃসংযোগ সৃষ্টিকারী এমন একটি পদ্ধতি যা বিভিন্ন জাতির সরকার, প্রতিষ্ঠান এবং জনগণের মধ্যে সমন্বয় ও মিথস্ক্রিয়ার সূচনা করে।

কয়েকজন পণ্ডিত মনে করেন, বিশ্বায়নের ধারণাটির সূত্রপাত হয়েছে আধুনিক যুগে। আবার কেউ কেউ ভিন্নমত পোষণ করে বলেন যে এর সুদীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। অনেক লেখক বিশ্বায়নের শুরুর সময়কে পিছনের দিকে প্রসারিত করে যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছেন যে বিশ্বায়নের ধারণা রাজনৈতিক বিশ্লেষণের সাথে সম্পূর্ণ অচল ও অর্থহীন।

আন্দ্রে গ্রান্দার ফ্র্যাঙ্ক একজন জার্মান-আমেরিকান অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ ও সমাজ বিজ্ঞানী এবং নির্ভরশীলতা তত্ত্বের সমর্থক, বিশ্বায়নের উৎপত্তি সুদূর অতীতে এ ধারনার একজন (সম্ভবত) গোঁড়া সমর্থক। ফ্র্যাঙ্ক মনে করেন, খ্রিষ্টপূর্ব তিন হাজার অব্দে যখন সুমেরীয় ও সিন্ধু সভ্যতার মাঝে বাণিজ্যের প্রচলন ঘটে তখন থেকে বিশ্বায়নের ধারণা বর্তমান।

আধুনিক বিশ্বায়নের শিকড় এমনকি প্রাগৈতিহাসিক যুগের শুরুর দিকে খুঁজলেই পাওয়া যায়। তখনকার মানুষ পাঁচ মহাদেশে তাদের ভৌগোলিক সীমানা বাড়িয়েছেন যা বিশ্বায়ন প্রতিষ্ঠার এক গুরুত্বপূর্ণ উপদান। কৃষির উন্নয়ন যাযাবর জাতিকে বসতি স্থাপন করে সুস্থিত জীবনযাপনে সহায়তা করেছে যা বিশ্বায়নের ধারণাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। কিন্তু তাদের মাঝে যোগাযোগ ও প্রযুক্তির অভাব থাকায় বিশ্বায়ন ত্বরান্বিত হয়নি। উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে মানুষ যখন মূলধন ও শ্রমের গতিশীলতার সাথে পরিবহন খরচ কমিয়ে একটি ছোট বিশ্বের দিকে এগিয়ে যায় তখন বিশ্বায়নের সমসাময়িক ধারাগুলো প্রবর্তিত হতে থাকে।

পূর্বে হেলেনীয় যুগে(অ্যালেক্সান্ডার দি গ্রেট এঁর মৃত্যু থেকে রোম সাম্রাজ্যের উত্থান পর্যন্ত সময়কাল) ভারত থেকে স্পেন পর্যন্ত বিস্তৃত বাণিজ্যিক নগর কেন্দ্রগুলো এবং আলেকজান্দ্রিয়া, অ্যাথেন্স ও এ্যাণ্টিয়কের মত শহরগুলো সুবিস্তৃত গ্রিক সংস্কৃতিকে ঘিরে প্রবর্তিত হয়। সে সময়ের বৈশ্বিক অর্থনীতি ও সংস্কৃতির একটি ধারা যা প্রাচীন বিশ্বায়ন নামে পরিচিত। তখন ব্যবসা-বাণিজ্য বিশ্বব্যাপী প্রচলিত ছিল আর সে সময়েই প্রথমবারের মত ‘ বৈশ্বিক উদার দৃষ্টিভঙ্গি’ ধারণার জন্ম হয়।

ইসলামি স্বর্ণযুগ, বিশ্বায়নের পূর্ব ধাপগুলোর একটি, যখন ইহুদি ও মুসলিম বনীকগণ এবং পর্যটকরা বিশ্বব্যাপী একটি টেকসই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যখন গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যশস্য যেমন চিনি, তুলা ইত্যাদি অধিক পরিমাণে মুসলিম বিশ্বে চাষাবাদ করা হত। ফলত ফসল, ব্যবসা-বাণিজ্য ও জ্ঞান বিজ্ঞানে বিশ্বায়ন ঘটে।

প্রাচীন বিশ্বায়নের পরবর্তী ধাপ প্রারম্ভিক বিশ্বায়ন। এ ধাপকে প্রারম্ভিক বলার কারণ এটি আধুনিক বিশ্বায়নের পূর্বের ধাপ। ভৌগোলিক আবিষ্কারের যুগে বিশ্বায়নে ব্যাপক পরিবর্তন আসে, যার প্রথম পর্যায়ে নতুন বিশ্বের(আমেরিকা ও এর আশেপাশের দ্বীপসমূহ) সাথে ইউরেশিয়া ও আফ্রিকার সাংস্কৃতিক, জৈবনিক ও বস্তুগত দিক দিয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সাধিত হয়।

উনিশ শতকে বিশ্বায়ন আধুনিকতার দিকে এগিয়ে যায়। শিল্প প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন বাড়িয়ে খরচ কমানোর নীতি ব্যবহার হয়, এতে দ্রব্যসামগ্রীর দাম কমে যায়। অপরদিকে বর্ধিত জনসংখ্যার নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের চাহিদাও বাড়তে থাকে। এ শতকের সাম্রাজ্যবাদ নীতি বিশ্বায়নকে চূড়ান্ত রূপ দেয়। ১৯ শতকে বিশ্ব যতটা পিছিয়ে ছিল ২০ শতকে তার দ্বিগুন এগিয়ে নিয়ে যায় বিশ্বায়ন। যেখানে সপ্তাহ থেকে মাসাধিক কাল লাগতো কোন পণ্য পরিবহনে সেখানে ২০ শতকে তা কয়েক ঘণ্টা থেকে অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশে পরিবহন করা গেছে। এভাবেই দিনে দিনে প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসার এবং তার ফলে বিশ্বায়নের ব্যাপ্তি সমাজের গণ্ডি অতিক্রম করে ব্যক্তিমানুষের জীবনেও প্রবল প্রভাব হিসেবে দেখা দিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *