বাংলাদেশ: সোমবার ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ
৫ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ১৩ই সফর, ১৪৪৩ হিজরি

  বাংলাদেশ: সোমবার ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ১৩ই সফর, ১৪৪৩ হিজরি  

শেষ আপডেটঃ ১:৫২ পিএম

বেহুলার শুরু ও শেষ

প্রাচীন মঙ্গলকাব্য মনসামঙ্গলের প্রধান ও বিখ্যাত চরিত্র বেহুলা। এই চরিত্রের মাঝে চিরাচরিত বাঙালীর নারীর নমনীয়তা ও স্বামী এবং পরিবারের প্রতি ভালোবাসা ছাড়াও আরও একটি জিনিস ফুটে উঠেছে তা হলো অসীম সাহসিকতা।

বেহুলার সংগ্রামের গল্প জানতে হবে চলে যেতে হবে সংগ্রামের একদম শিকড়ে। সনাতন ধর্মে দেবতা শিবের সকল পুত্র কন্যাদের মধ্যে একজন হলেন “মনোসা”। যে হচ্ছে মুলত সাপের দেবী। এখন হিন্দু ধর্মে মনোসা পুজা মোটামুটি সবাই করলেও এ গল্পের সূচনার দিকে অন্যান্য দেবদেবীর পুজা করা হলেও সাপের দেবী হবার কারনে মনোসার পুজা কেউই করতোনা। এ নিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই মনোসার মনে ক্ষোভ ছিলো এবং সে তার পিতার কাছে এর সমাধান চাইলে তার পিতা শিব তাকে বলেন কোনো ভক্তিমান শৈবকে অর্থাৎ যে ভক্তিসহকারে শিবের পূজা করে এমন কাউকে মনোসার পূজাতে রাজি করানো গেলে মর্ত্যলোকে মনোসা পূজার প্রচলন করানো সম্ভব হবে।

তখনকার সময়ে সবথেকে ভক্তিমান শৈব ছিলেন চাঁদ সদাগর। যিনি সম্পর্কে এ গল্পের প্রধান চরিত্র বেহুলার শ্বশুর। মনোসা তার পূজা কামনার জন্য চাঁদ সদাগর কেই বেছে নেয়। কিন্তু এ ব্যপারে চাঁদ সদাগর সরাসরি অস্বীকৃতি জানায়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে মনোসা শুরু করে চাঁদ সদাগরের বিভিন্ন ক্ষতি করার যাতে করে চাঁদ সদাগর ভয় পেয়ে মনোসা পূজা শুরু করে দেয়।

মনোসার অভিশাপে একে একে চাঁদ সদাগরের ছয় পুত্র সাপের কামড়ে মারা যায় তবুও চাঁদ সদাগর রাজি হয় না মনোসা পূজা করতে। এক পর্যায়ে চাঁদ সদাগর ও তার স্ত্রীর আরও একটি পুত্র সন্তান হয় যাকে ঘিরেই বেহুলার সংগ্রাম প্রকাশিত হয় এ কাব্যে। চাঁদ সদাগরের এ পুত্র সন্তানের নাম রাখা হয় ” লখিন্দর” সমসাময়িক সময়ে চাঁদ সদাগরের বন্ধুর ঘরে জন্ম হয় এক কন্যা সন্তানের, জন্ম হয় “বেহুলার”।

মনোসার অভিশাপ কিছুটা এমন ছিলো যে চাঁদ সদাগরের প্রত্যেক পুত্রের মৃত্যু হবে তার বাসররাতেই। এবং এভাবেই চাঁদ সদাগরের ছয় জন পুত্রই মারা যায়। এবার সময় গড়ায় আসে লখিন্দরের বিয়ের পালা। লখিন্দরের বিয়ে ঠিক হয় বেহুলার সাথে এবং বাসর ঘর নিয়েও ছিলো প্রবল সতর্কতা। পুরো বাসর ঘর ঘিরে থাকে লৌহ প্রাচীর ঠিক করা হয়েছিলো এতে এক বিন্দু পরিমাণ ও ছিদ্র থাকতে পারবে না কিন্তু মনোসার কু চক্রান্তে এ ঘরে একটি ছিদ্র থেকেই যায়।

নিয়তির নির্মম পরিহাস সে রাতেই সাপের ছোবলে প্রান হারায় লখিন্দর। তখনকার নিয়ম ছিলো কাউকে সাপে কাটলে মৃতদেহ ভেলায় ভাসিয়ে দেয়া হতো। একইভাবে লখিন্দরের মৃতদেহ ও ভেলায় ভাসিয়ে দেয়া হচ্ছিলো কিন্তু বেহুলা ও নাছোড়বান্দা তার বিশ্বাস তার স্বামীর প্রান ফিরবেই তাই সে ও লখিন্দরের সাথেই ভেলার ভাসতে থাকে এবং মনোসা দেবীর কাছে প্রার্থনা করতে থাকে। এদিকে মনোসার মন ও কিছুতেই গলেনা।

এক পর্যায়ে সে গ্রামে আসে মনোসার পালক মাতা “নিতা”। নিতা -ই একদিন বেহুলার এ অবস্থা দেখে ঠিক করে সে বেহুলাকে স্বর্গলোকে নিয়ে যাবে মনোসার সাথে দেখা করাতে। এরপর এক সময় এ কাজে সফলতাও আসে বেহুলার অক্লান্ত অনুনয় আবেদন ও প্রার্থনায় মনোসা কিছুটা রাজী হয়। সে লখিন্দরের প্রান ফিরিয়ে দিতে রাজী হয় কিন্তু শর্ত জুড়ে দেয় যে বেহুলাকে চাঁদ সদাগরকে রাজি করাতে হবে মনোসা পুজা করার জন্য।

বেহুলা কথা দেয় সে চাঁদ সদাগর কে রাজি করাবে। এরপরই মনোসা লখিন্দরের প্রান ফিরিয়ে দেয় এবং তার প্রায় পচে যাওয়া শরীর ও আগের মতো করে দেয়। একইসাথে চাঁদ সদাগরের অন্যান্য পুত্রদের ও জীবীত করে দেয়। এরপর বেহুলা এবং লখিন্দর মর্ত্যলোকে ফিরে আসে এবং চাঁদ সদাগরকে রাজি করায় মনোসা পূজা করতে। এক পর্যায়ে পুত্র ফিরে পাওয়ার আনন্দে চাঁদ সদাগর রাজি হয় এবং এর মাধ্যমেই শেষ হয় বেহুলার সংগ্রাম,মর্ত্যলোকে শুরু হয় দেবী মনোসার পূজা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *