মধুর ক্যান্টিন নিয়ে কিছু কথা

মধুর ক্যান্টিন নিয়ে কিছু কথা
ছবি সংগৃহীত

রেস্তোরাঁ যখন হয়ে উঠে রাজনীতির পাঠশালা: ১৯৩৯ সালের পর থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতির আঁতুড়ঘর এই ‘মধুর ক্যান্টিন’। দেশের অধিকাংশ জাদরেল ও তাবড় রাজনীতিবিদদের হাতেখড়ি এই ক্যান্টিনে।

দেশভাগের পর ১৯৪৯ এর বিশ্ববিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের আন্দোলন, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২-র শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচন, ১৯৬৯ থেকে, ১৯৭১ পর্যন্ত বহু মিটিং হয়েছে এই ক্যান্টিনে। ১৯৭১ সাল পর্যন্ত একাধিক ঘটনার সাক্ষী থেকেছেন মধুসূদন দে। হয়তো দেশের মুক্তিতে মধুসূদনের সমর্থন ছিল।

১৯৯৭ আহমদ ছফার ‘মধুদার স্মৃতি’ নামে এক প্রবন্ধের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। রাজনীতিতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ স্থান হয়ে উঠেছিল মধুর রেস্তোরাঁ। যেমনটা আহমদ ছফা তাঁর প্রবন্ধে লিখেছেন-

মধুদা ক্যান্টিনে সকালের দিকে বসতেন না। বাইরে নানা কাজে ঘোরাঘুরি করতেন। দুপুরে সময় পেলে একবার এসে ক্যাশে বসতেন। সময় না পেলে আসতেন একেবারে চারটের পর। এসেই কর্মচারীদের জিগ্যেস করতেন, আইজকা মোয়াজ্জেম সাব আইছিল? তাঁর লোকেরা বলত, হ। তিনি বললেন, লেখো বিশ কাপ চা। জাফর সাব? হ। লেখো বিশ কাপ। এমনি করে যে সমস্ত ছাত্রনেতা মধুর ক্যান্টিনে বসে রাজনৈতিক কাজকর্ম চালিয়ে যেতেন, তারা কে কয় কাপ চা খেতেন, মধুদা বলবেন কি তারা নিজেরাও বলতে পারতেন না। অতএব মধুদা অনুমান করে এক একটা সংখ্যা বসিয়ে দিতেন। যেমন মোয়াজ্জেম সাব বিশ কাপ, ফরমান উল্লাহ পনেরো কাপ। চায়ের কাপের অঙ্কটা তো মধুদা বসাতেন। টাকাটা আদায় হত কি না আমার সন্দেহ।

অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম লিখেছেন, মধুর ক্যান্টিনে তিনটি বড় টেবিল ছিল যেখানে প্রায় ৩০ জন বসতে পারত। এই তিনটি টেবিল অলিখিতভাবেই ঘোষিত ছিল তৎকালীন বিচক্ষণ ছাত্র নেতাদের জন্য। সকাল থেকে সন্ধ্যা আইন বিভাগের সেই ছাত্রদের দখলেই টেবিলগুলো থাকত। দেশ বিভাগের আগে আমি সেখানে বিখ্যাত বামপন্থী নেতাদেরকেও দেখেছি যাদের মধ্যে ছিলেন এস. এম. আলী এবং মুনির চৌধুরী।

তিনি আরও লিখেছেন, “১৯৪৮ এর ১১ মার্চ এবং ১৯৫২ এর ২১ ফেব্রুয়ারির কার্যক্রমের সকল পরিকল্পনা এবং প্রস্তুতি এই মধুর ক্যান্টিনে বসেই নেওয়া হয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই পুলিশ এবং ইপিআর বাহিনীর চোখে পড়ে যান মধু। এদের আক্রমণে বহুবার মধুর ক্যান্টিনে ধ্বংসযজ্ঞ চলেছে।”

কেমন দেখতে ছিল সবার প্রিয় মধুদা: ‘মধুদার স্মৃতি’ প্রবন্ধের ভূমিকায় সলিমুল্লাহ খান মধুদা’র কিছুটা বর্ণনা দেয়ার চেষ্টা করেছেন। ‘মধুদার গায়ের রঙ্গ ধবধবে শাদা হইলেও দেখাইত একটু তামাটে। মহাদেবের মত চেহারা হইলেও তাঁহার মুখের জবান ছিল আদি এবং অকৃত্রিম ঢাকাইয়া।’

এজেড নিউজ বিডি ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

মধুর ক্যান্টিন নিয়ে কিছু কথা

মধুর ক্যান্টিন নিয়ে কিছু কথা
ছবি সংগৃহীত

রেস্তোরাঁ যখন হয়ে উঠে রাজনীতির পাঠশালা: ১৯৩৯ সালের পর থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতির আঁতুড়ঘর এই ‘মধুর ক্যান্টিন’। দেশের অধিকাংশ জাদরেল ও তাবড় রাজনীতিবিদদের হাতেখড়ি এই ক্যান্টিনে।

দেশভাগের পর ১৯৪৯ এর বিশ্ববিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের আন্দোলন, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২-র শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচন, ১৯৬৯ থেকে, ১৯৭১ পর্যন্ত বহু মিটিং হয়েছে এই ক্যান্টিনে। ১৯৭১ সাল পর্যন্ত একাধিক ঘটনার সাক্ষী থেকেছেন মধুসূদন দে। হয়তো দেশের মুক্তিতে মধুসূদনের সমর্থন ছিল।

১৯৯৭ আহমদ ছফার ‘মধুদার স্মৃতি’ নামে এক প্রবন্ধের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। রাজনীতিতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ স্থান হয়ে উঠেছিল মধুর রেস্তোরাঁ। যেমনটা আহমদ ছফা তাঁর প্রবন্ধে লিখেছেন-

মধুদা ক্যান্টিনে সকালের দিকে বসতেন না। বাইরে নানা কাজে ঘোরাঘুরি করতেন। দুপুরে সময় পেলে একবার এসে ক্যাশে বসতেন। সময় না পেলে আসতেন একেবারে চারটের পর। এসেই কর্মচারীদের জিগ্যেস করতেন, আইজকা মোয়াজ্জেম সাব আইছিল? তাঁর লোকেরা বলত, হ। তিনি বললেন, লেখো বিশ কাপ চা। জাফর সাব? হ। লেখো বিশ কাপ। এমনি করে যে সমস্ত ছাত্রনেতা মধুর ক্যান্টিনে বসে রাজনৈতিক কাজকর্ম চালিয়ে যেতেন, তারা কে কয় কাপ চা খেতেন, মধুদা বলবেন কি তারা নিজেরাও বলতে পারতেন না। অতএব মধুদা অনুমান করে এক একটা সংখ্যা বসিয়ে দিতেন। যেমন মোয়াজ্জেম সাব বিশ কাপ, ফরমান উল্লাহ পনেরো কাপ। চায়ের কাপের অঙ্কটা তো মধুদা বসাতেন। টাকাটা আদায় হত কি না আমার সন্দেহ।

অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম লিখেছেন, মধুর ক্যান্টিনে তিনটি বড় টেবিল ছিল যেখানে প্রায় ৩০ জন বসতে পারত। এই তিনটি টেবিল অলিখিতভাবেই ঘোষিত ছিল তৎকালীন বিচক্ষণ ছাত্র নেতাদের জন্য। সকাল থেকে সন্ধ্যা আইন বিভাগের সেই ছাত্রদের দখলেই টেবিলগুলো থাকত। দেশ বিভাগের আগে আমি সেখানে বিখ্যাত বামপন্থী নেতাদেরকেও দেখেছি যাদের মধ্যে ছিলেন এস. এম. আলী এবং মুনির চৌধুরী।

তিনি আরও লিখেছেন, “১৯৪৮ এর ১১ মার্চ এবং ১৯৫২ এর ২১ ফেব্রুয়ারির কার্যক্রমের সকল পরিকল্পনা এবং প্রস্তুতি এই মধুর ক্যান্টিনে বসেই নেওয়া হয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই পুলিশ এবং ইপিআর বাহিনীর চোখে পড়ে যান মধু। এদের আক্রমণে বহুবার মধুর ক্যান্টিনে ধ্বংসযজ্ঞ চলেছে।”

কেমন দেখতে ছিল সবার প্রিয় মধুদা: ‘মধুদার স্মৃতি’ প্রবন্ধের ভূমিকায় সলিমুল্লাহ খান মধুদা’র কিছুটা বর্ণনা দেয়ার চেষ্টা করেছেন। ‘মধুদার গায়ের রঙ্গ ধবধবে শাদা হইলেও দেখাইত একটু তামাটে। মহাদেবের মত চেহারা হইলেও তাঁহার মুখের জবান ছিল আদি এবং অকৃত্রিম ঢাকাইয়া।’

এজেড নিউজ বিডি ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

Download