Moon world Resort 2210031010

‘চাঁদ’ নেমে আসছে দুবাইয়ে, খরচ ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার

আগের সংবাদ
fa

যে ছবির জন্য পুলিৎজার পান ফাহমিদা

পরের সংবাদ

যুদ্ধশিশু প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট ঢাকা

প্রকাশিত: ২০২২-১০-০৯ , ৯:০৬ অপরাহ্ণ
আপডেট: ২০২২-১০-০৯ , ৯:০৬ অপরাহ্ণ
image 402653 1615932421

রঞ্জনা বিশ্বাস কবি, কথাশিল্পী ও গবেষক। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএসএস। তার ‘বেদে জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা’, ‘বাংলাদেশের পালকি ও পালকিবাহক: নৃ-তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিকধারা’, ‘লোকসংস্কৃতিতে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ’, ‘বাংলাদেশের লোকধর্ম’ পাঠকদের মধ্যে সাড়া ফেলেছে। এরই মধ্যে অর্জন করেছেন ‘কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার ২০১৫’, ‘ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার ২০২০’সহ বেশকিছু পুরস্কার।

স্বাধীনতা-পরবর্তী ক্রমেই যুদ্ধশিশু প্রশ্নে নারী পুনর্বাসনের বিষয়টি জটিল হয়ে উঠেছিল। সেবা সদনগুলোয় তাদের গর্ভপাত ঘটানো হয়েছিল- যারা যুদ্ধের শেষ দিকে গর্ভধারণ করেন। যুদ্ধের শুরুতে যারা গর্ভবতী হয়ে পড়েন, তাদের অপেক্ষা করতে হয়েছিল পূর্ণ মেয়াদে শিশু প্রসব না করা পর্যন্ত। ধর্ষণের শিকার মায়েরা ১৯৭১ সালের অক্টোবর থেকেই শিশু জন্ম দিতে শুরু করেন। ডাক্তার ডেভিস জানান- ‘যত নারী গর্ভধারণ করেন, তাদের অন্তত ১০ শতাংশের স্বাধীনতার আগেই সন্তান প্রসব করার কথা।’ কিন্তু ওই ১০ শতাংশের কত মা আত্মহত্যা করেছিলেন কিংবা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে খুন হয়েছিল, এর হিসাব আমাদের অজনা। তবে বাংলাদেশের যুদ্ধশিশুদের বিষয়ে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য নথিপত্র ও দলিলাদি সংরক্ষিত আছে মাদার তেরেসার মিশনারিজ অব চ্যারিটির ‘শিশুভবন’-এ। এটি বর্তমানে ঢাকার ইসলামপুরে অবস্থিত। ওই সময় মিশনারিজ অব চ্যারিটির সুপিরিয়র ছিলেন সিস্টার মেরি। তিনি নির্যাতিত নারীদের চিকিৎসা ও সন্তানসম্ভবাদের কাউন্সেল করেছিলেন- যাতে তারা সন্তান জন্মদানে উৎসাহ পান। তিনি সেসব নির্যাতিত মায়েদের খুঁজে বেড়াতেন এবং তাদের পরিচর্যার জন্য শিশুভবনে নিয়ে আসতেন। তাদের সেবার ব্যাপারে গোপনীয়তা রক্ষার শর্ত মেনে চলতেন। সংক্ষেপে সিস্টারদের কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, সন্তানসম্ভবা কোনো নারীকে কখনো কোনো ধরনের প্রশ্ন (যেমন- কোথায়, কখন ও কীভাবে গর্ভধারণ করেন বা কে সন্তানের বাবা ইত্যাদি সম্পর্কে) যেন জিজ্ঞাসা করা না হয়। প্রত্যেক অন্তঃসত্ত্বাকে নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছিল তাদের গর্ভধারণের বিষয়ে তারা কখনো কোনো প্রশ্নের সম্মুখীন হবেন না। ঢাকায় মিশনারিজ অব চ্যারিটির সুপিরিয়র সিস্টার মেরি তার স্মৃতিচারণে বলেন, গর্ভবতীকে তার গর্ভস্থ সন্তানের পিতৃত্ব নিয়ে জিজ্ঞাসা করা যাবে না, ধর্ষণের শিকার নারী তার অবমাননা বিষয়ে কিছুই বলবেন না বা তাকে বলতে বাধ্য করার চেষ্টা করা যাবে না। এ ধরনের নিশ্চয়তাদানের জন্য সন্তানসম্ভবারা অনেক স্বস্তিবোধ করেন এবং গর্ভমোচনের পরিবর্তে সন্তান প্রসবের সিদ্ধান্ত নেন।’ ওই সময় তিনি এসব মায়ের বিশ্বাস করাতে পেরেছিলেন যে, মিশনারিজ অব চ্যারিটি তাদের সন্তানদের সব দায়িত্ব নেবে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭১ সালের ২১ ডিসেম্বর মাদার তেরেসা কলকাতা থেকে বাংলাদেশে আসেন। তখনো বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালি কারাগারে বন্দি। মাদার তেরেসা তখন বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের সঙ্গে দেখা করেন এবং বাংলাদেশের নির্যাতিত নারীদের অবস্থা নিয়ে আলোচনা করেন। রাষ্ট্রপতি মাদার তেরেসাকে সাদরে অভ্যর্থনা জানান এবং তাকে বাংলাদেশের পাশে থাকার জন্য অনুরোধ করেন। মূলত দুস্থ নারীদের পুনর্বাসন সংক্রান্ত কর্মসূচি নিয়ে সরকারকে সহায়তা করার জন্য রাষ্ট্রপতি তাকে অনুরোধ করেন। এই প্রসঙ্গে ’৭১-এর যুদ্ধশিশু অবিদিত ইতিহাস বইয়ের লেখক মুস্তফা চৌধুরী বলেন, ‘স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই কলকাতা থেকে মাদার তেরেসা ২১ ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখে ঢাকা এসে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুল ইসলামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন- যখন তারা বাংলাদেশের অবমানিত নারীদের অবস্থা বিষয়ে আলোচনা করেন, নতুন সরকারের কোনো ধারণা ছিল না কী করবে। দেশের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান তখন পাকিস্তানে জেলে বন্দি ছিলেন। সময়ের গুরুত্ব বুঝে প্রেসিডেন্ট ইসলাম মাদার তেরেসাকে জানান, বাংলাদেশ সরকার মনে করে, মাদার তেরেসার সঙ্গে অবমানিত নারী ও যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ নিয়ে কাজ করবার উপযুক্ত সময় এটা। সরকার মাদার তেরেসার ওপর সম্পূর্ণ আস্থাশীল ছিলেন। কারণ ততদিনে তিনি সারা বিশ্বে কাজ করে সুনাম অর্জন করেছেন। পূর্ণ স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিয়ে রাষ্ট্রপতি মাদারকে অনুরোধ করেন- তিনি যেন দুস্থ নারীদের মুক্তি বিষয়ক কর্মসূচি নিয়ে সরকারের সহায়তায় এগিয়ে আসেন। ওই সময় পুরান ঢাকার ২৬ ইসলামপুরে অবস্থিত ৩৫০ বছরের পুরনো পর্তুগিজ মনাস্টারিতে আটজন মিশনারিজ অব চ্যারিটির সন্ন্যাসিনী ধর্ষণের শিকার নারীদের জন্য একটি আশ্রয় কেন্দ্র চালু রেখেছিলেন।’ এরপর ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে মাদার তেরেসা আবার বাংলাদেশে আসেন। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন ভারতের চার সিস্টার ও দুই নার্স এবং প্রতিষ্ঠা করলেন শিশুভবন। এ শিশুভবনই হয়ে ওঠে যুদ্ধশিশুদের প্রথম ও শেষ আশ্রয়। এ সময় মাদার তেরেসাকে সাহায্য করেন আর্চবিশপ থিওটোনিয়াস অমল গাঙ্গুলি (সিএসসি) ফাদার বেজামিন লাববে। তিনি Christian Organization for Relief and Rehabilitation (CORR)-এর পরিচালক ছিলেন। ওই সময় (CORR) ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেয়েছিল।

এদিকে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত নারী পুনর্বাসন বোর্ড ব্যাপকভাবে কাজ করছিল। কিন্তু ক্রমেই নারী পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে যুদ্ধশিশুর প্রশ্নটি জটিলতা তৈরি করে। সরকার তখন অনাথ, অবাঞ্ছিত যুদ্ধশিশুদের নিয়ে মহাসংকটে পড়ে যায়। কারণ বাংলাদেশের প্রথা ও ঐতিহ্য অনুসারে পিতৃপরিচয়হীন শিশুকে মায়ের কাছে রাখার কোনো উপায় ছিল না। সামাজিক রক্ষণশীলতার চাপে পড়ে সেই মায়েরা তাদের শিশুদের ত্যাগ করার জন্য বদ্ধপরিকর হয়ে ওঠেন। তাছাড়া পাকিস্তানি সেনাদের প্রতি বাঙালিদের ঘৃণা এবং তাদের লাম্পট্যের কারণে জন্ম নেয়া শিশুদের সমাজ যে সহজভাবে নেবে না, সেটিও মায়েরা জানতেন। সমাজকে ও সমাজের এই মনস্তত্ত্বকে অস্বীকার করার দুঃসাহস যেমন অসহায় নির্যাতিত মায়ের ছিল না, তেমনি সরকারেরও ছিল না। তাই সরকারও মায়েদের সিদ্ধান্তকে সাদরে গ্রহণ করে এবং ধর্ষণের ফলে জন্ম নেয়া শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে মাকেও চাপ দেয়নি। তবে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানিকভাবে জন্ম নেয়া শিশুর সংখ্যা ২৫ হাজারের বেশি নয়। কিন্তু সমাজ বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে এ সংখ্যাটিই তখন বাংলাদেশ সরকারের জন্য ব্যাপক বিড়ম্বনার কারণ হয়ে উঠেছিল। ওই সময় দেশের অভ্যন্তরে বসবাসরত কোনো ব্যক্তি কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠান এই শিশুদের আশ্রয় দেওয়া বা দত্তক নেয়ার জন্য এগিয়ে আসেনি।

এ প্রসঙ্গে মুস্তফা চৌধুরী বলেন, ‘১৯৭২ সালে কেউই যুদ্ধশিশুদের দত্তক নিতে এগিয়ে আসেননি। মসজিদ, মন্দির অথবা প্যাগোডা থেকেও কেউ আসেননি (একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল মাদার তেরেসার মিশনারিজ অব চ্যারিটি…)। যতদূর জানা যায় সামাজিক সেবা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, পারিবারিক চিকিৎসক আত্মীয় অথবা পারিবারিক বন্ধু- কেউই যুদ্ধশিশুদের দত্তক নিতে এগিয়ে অসেনি। তাছাড়া ওই সময় দত্তক দেওয়া, নেয়া ও নিয়ন্ত্রণের জন্য কোনো আইন চালু ছিল না। এ বিষয় পূর্বে প্রণীত আইন Gurdian and War Act. 1890 I Muslim Family Ordinance 1911 বাংলাদেশে বর্তায়। এই আইন অনুসারে উপযুক্ত আদালত অপ্রাপ্ত বয়স্ক শিশুর দেখাশোনার ভার শিশুর সর্বোচ্চ মঙ্গলের স্বার্থে যে কারো ওপর ন্যস্ত করতে পারে। সোজা কথায় বললে, মুসলমান আইনে দত্তক নেবার ব্যবস্থা নেই- যে রকম পশ্চিমে আইনি ব্যবস্থা রয়েছে।’

বাংলাদেশের প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী কোনো অনাথ শিশু তার রক্তের সম্পর্কের যে কোনো আত্মীয়ের কাছে বড় হয়ে ওঠে, আশ্রয় ও নিরাপত্তা পায়। মুস্তাফা চৌধুরী বলেন, “বাংলাদেশের এতিম শিশুর দায়িত্ব নেয়ার জন্য বর্ধিত পরিবারের কেউ না কেউ এগিয়ে আসেন। অনানুষ্ঠানিকভাবে এ ব্যবস্থাই প্রচলিত। অর্থাৎ আত্মীয়স্বজনরা আদালতে গিয়ে আইনসম্মতভাবে দত্তক নিতে অভ্যস্ত নন। সে জন্যই সাধারণত আনুষ্ঠানিক দত্তক ব্যবস্থা বাংলাদেশে দেখা যায় না। …‘অভিভাবকত্ব’ বাংলাদেশে অধিকতর পছন্দের সামাজিক রীতি যাতে শিশু ও তার পরিবারের ওপরে আইনি ব্যবস্থার কোনো অভিঘাত বর্তায়। এ রকম পরিস্থিতিতে সরকার বেশ বিপাকে পরে যায়। পরিস্থিতি এমন ছিল যে, সমাজের মানুষ যুদ্ধশিশুদের স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারছিল না। তাদের প্রতি কোনো রকম করুণাও প্রদর্শিত হয়নি। কেননা তারা জারজ, পিতৃপরিচয়হীন, শত্রুপক্ষের লালসা থেকে জাত। বীরাঙ্গনাদের জন্য গর্ভপাত ও তাদের বিয়ের বিষয়ে সরকার যেভাবে জনগণকে সহানুভূতিশীল হওয়ার জন্য আহ্বান জানাতে পেরেছে, তেমন করে যুদ্ধশিশুর ব্যাপারে কিছু বলতে পারছিল না সরকার। ফলে যুদ্ধশিশু হয়ে উঠেছিল মারাত্মক এক চ্যালেঞ্জ। কেননা যুদ্ধশিশুদের জন্ম ইতিহাসে যে গভীর সামাজিক কলঙ্কের দাগ লেগে রয়েছে, তাতে ওই শিশুদের বাংলাদেশে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো অথবা দত্তক দেওয়া এক রকম অসম্ভব ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল।”

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির হৃৎস্পন্দন বুঝতেন। ফলে সরকার বেশ সহানুভূতি নিয়ে উচ্চ মহলের সঙ্গে যুদ্ধশিশুদের ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা শুরু করেন। আলোচনায় মন্ত্রিসভার কয়েক সদস্য বলেন, ‘আরও স্পর্শকাতর ভাষায় জনগণকে পুনরায় এ বিষয়ে সচেতন করে তুলতে হবে।’ কিন্তু বঙ্গবন্ধু নিশ্চিত ছিলেন- যুদ্ধশিশুদের কেন্দ্র করে সমাজের যে মনোভাব, তা সহজে পাল্টানো সম্ভব হবে না। তাদের নিয়ে কথা চলতেই থাকবে। এ রকম পরিস্থিতি শিশু বা মা- কারো জন্যই কল্যাণকর হবে না। এ জন্য সরকার বিকল্প ব্যবস্থা ও পরামর্শ চাচ্ছিল। বঙ্গবন্ধু তখন বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে জেনেভার International Social Service (ISS)-কে অনুরোধ করেন দত্তক বিষয়ে ব্যবস্থা ও সুপারিশ করতে।

নারী পুনর্বাসন ব্যাপারে সরকার ও সংবাদপত্রগুলো সোচ্চার হলেও যুদ্ধশিশু প্রসঙ্গে উভয়ই নীরব থাকে। মুস্তফা চৌধুরী বলেন, “প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে যে, সরকার এ বিষয়ে যথাসাধ্য সম্ভব বিজ্ঞাপন দেওয়া বা আগ্রাসী প্রচারণা থেকে বিরত থাকেন। এর বিকল্প উপায় হিসেবে সরকার শান্তভাবে বিষয়টি নিয়ে ISS-এর সঙ্গে কাজ শুরু করে, সুইজ্যারল্যান্ডের জেনেভায় ISS-এর সদর দপ্তর, সারা বিশ্বে এর শাখা-প্রশাখা ছড়ানো।… বাংলাদেশ সরকার যখন ISS-এর পরামর্শ চায়, তখন বলতে গেলে সরকারের কাছে যুদ্ধশিশুদের জন্মানোর কোনো নথি ছিল না (শুধু শিশুভবনের নথি ছাড়া)। এ রকম চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সবকিছুই এত গোপনীয়তার সাথে ঘটছিল যে, কেবল দু’চারটে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, জন্মদাত্রী মা অথবা তাদের পরিবারের কাছে পৌঁছাতে চেষ্টা করছিলেন।” এছাড়া সরকারের সন্দেহ ছিল যে, যুদ্ধশিশু ও দত্তক নেয়া-দেওয়ার মতো সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হিতে বিপরীত হতে পারে। তাই সরকার তার দত্তক প্রক্রিয়ার বিষয়ে জনগোষ্ঠীকে উৎসাহ দেওয়া অথবা কোনো ব্যাখ্যা দেওয়ার পক্ষপাতী ছিল না।

খুব সন্তর্পণে সরকার শিশুদের জন্য যে আইন রয়েছে, সেটি পরীক্ষা করে বোঝার চেষ্টা করল তা যুদ্ধশিশুদের জন্য যথার্থ কি না। কমিটি গঠন করে যুদ্ধশিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আরো গবেষণা করার জন্য বলা হলো। মন্ত্রিসভায় মুজিব দত্তক ফাইলের দায়িত্বে যারা রয়েছেন, তাদের সাবধান করে দিয়ে বলেছিলেন- ‘আন্তর্জাতিকভাবে শুধু মুখে বড় বড় বুলি আওড়ালে চলবে না। যাদের ওপর দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে, তারা অবশ্যই যার যার দায়িত্ব মোচনে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকবেন— শুধু কথার ফুলঝুরিতে কাজ হবে না।’ এরপর কয়েক সপ্তাহ ধরে শ্রম মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং আইন ও পার্লামেন্টারি অ্যাফেয়ার্স মন্ত্রণালয় যুদ্ধশিশুদের বিষয়ে সংক্ষিপ্ত বিবরণী উপস্থাপন করে। এসব বিবরণী থেকে সরকার বুঝতে পারে, ‘অভিভাবকত্ব’ পালনে যত্ন, সুরক্ষা ও দত্তক প্রক্রিয়ার বিস্তারিত ব্যাখ্যার প্রয়োজন রয়েছে।

ওই সময় বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে ISS-এর জেনারেল ডিরেক্টর ওয়েলস সি ক্লাইন, ISS-এর অ্যাসোসিয়েট ডিরেক্টর সিডনি টালিসমেন ও জেনেভার ISS-এর উপদেষ্টা ম্যারি ডি লেভিন ঢাকায় আসেন। তাদের সঙ্গে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পরামর্শ প্রদান ও বাস্তবায়ন পর্যায় বাংলাদেশের দুটি সংস্থা কাজ করছিল। সংস্থা দুটি ছিল ISS ও বাংলাদেশ সরকারের সদিচ্ছার ফলে The Church World Service প্রকল্পের কাজ শুরু করার জন্য ৫০ হাজার ডলার অনুদান দেয়।

যখন সরকার যুদ্ধশিশুর বিষয়ে সমাধানে পৌঁছাতে চেষ্টা করছে, তখন শিশু অপহরণকারীদের দৌরাত্ম্য বেড়ে গেল। সরকার যখন কেবল যুদ্ধশিশুদের কথা ভাবছিল, তখন মাঠ পর্যায়ের আধিকারিক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা বহু সংখ্যক বেশি বয়সী অনাথ শিশুদের তাদের বিবেচনায় আনেন। কারণ তারাও পরিত্যক্ত এ অর্থে যে, তাদের অভিভাবক তাদের পরিত্যাগ করেছে। লেভিন সঙ্গে সঙ্গে সরকারকে এ ব্যাপারে সাবধান করেছিলেন এটি বলে যে- ‘বিভিন্ন দত্তক প্রতিষ্ঠান যে বিপুল হারে দেশ থেকে শিশুদের নিয়ে যেতে থাকে, সেটি থামানো মুশকিল হয়ে পড়েছিল।’ সরকার তখন কঠোর ভাষায় জানায়, যুদ্ধশিশুদের নিয়ে কোনো প্রবঞ্চনা চলবে না। আর এই পাচারকারীদের ওপর কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বলা হলো। পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলো।

এদিকে ISS 1972 সালের ২৭ মার্চ Inter Country Adoption a Solution for Some Children in Bangladesh শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনে ISS দত্তক নেয়ার ব্যাপারে সুপারিশ করে এবং তা বাস্তবায়নের জন্য কিছু শর্ত আরোপ করে। মুস্তফা চৌধুরী জানান, ‘যুদ্ধশিশুদের তাৎক্ষণিকভাবে দত্তক নেয়ার সুপারিশ করে ISS বাংলাদেশ সরকারকে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা করার পক্ষে তাগিদ দিয়ে সাবধান বাণী উচ্চারণ করে: বিলম্বে গর্ভমোচন এবং জীবননাশের বাস্তবমুখী বিকল্প যদি অন্তর্দেশিক দত্তক ব্যবস্থা হয়, তাহলে বাঙালি নারী ও এদের সন্তানের রক্ষাকল্পে একটি তাত্ত্বিক বিকল্পকে বাস্তব সমাধানের রূপ দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারকে উঠেপড়ে লাগতে হবে এবং সমাজকল্যাণ পরিদপ্তরের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলির সহযোগিতার একটি জরুরি কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের কাজ হাতে নিতে হবে। এতে আরো সুপরিশ করা হয়, এটা শারীরিকভাবে ও মানসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ যে, শিশুদের তাদের মায়েদের কাছে থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দূরে সরিয়ে নিতে হবে- যাতে মা এবং তার পরিবারের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ না পড়ে।’

আইএসএস-এর সুপারিশ ও পরামর্শগুলো হাতে পাওয়ার পর সরকারপক্ষ তা বিশ্লেষণ এবং কয়েক দফা আলাচনা করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কখনোই নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চাননি। তিনি চাননি জনগণ এই ইস্যুতে তাকে স্বৈরাচারী সরকার বলে আখ্যায়িত করুক। তিনি এটি পরিষ্কারভাবেই জানতেন, তার সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি যুদ্ধশিশু ও তাদের মায়েদের প্রতি কখনোই ইতিবাচক হবে না। তাই তিনি যুদ্ধশিশুদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে বদ্ধপরিকর ছিলেন। সদ্যোজাত এই শিশুদের অধিকার প্রশ্নেও তিনি ছিলেন আপসহীন। কয়েকদিন ধরে আলাপ-আলোচনার শেষে শেখ মুজিব আনুষ্ঠানিকভাবে সুপারিশমালায় তার অনুমোদন দেন।
আইএসএস-এর সুপারিশমালায় অনুমোদন দেওয়ার পর সরকার সব ধরনের আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়। নির্দেশ মোতাবেক শ্রম ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সমাজকল্যাণ ডিরেক্টরেটকে আন্তর্দেশিক দত্তক প্রক্রিয়ার আইন-কানুন তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়। দায়িত্ব পাওয়ার পর বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিরা যুদ্ধশিশুদের দত্তক নেয়ার বিষয়টি আইনসম্মত করার কাজে মনোনিবেশ করেন। ১৯৭২ সালের মার্চ ও অক্টোবরের মধ্যে নীতিনির্ধারক এবং আইন প্রণেতারা অসংখ্যবার একত্র হয়ে বাংলাদেশিদের দৃষ্টিতে বিদেশি দত্তক প্রক্রিয়ার বিচার, যুদ্ধশিশু ও সাধারণ অনাথ শিশুর সীমিত সুযোগ-সুবিধার আলোকে নানা রকম ঝুঁকির প্রবণতা পরীক্ষা করেন। এদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তাদের বলেছিলেন আইন তৈরির কাজে বেশি সময় না দিয়ে আগাম ভাবনাকে গুরুত্ব দিতে।

অবশেষে The Bangladesh Abandoned Children (Special Provisions) order 1972 জারি করলেন বঙ্গবন্ধু। যেহেতু ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে দত্তক প্রক্রিয়া সম্পর্কিত কোনো আইন ছিল না, সেহেতু প্রভিশনাল আদেশের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল পরিত্যক্ত শিশুদের জন্য Statutory Guardian (সংবিধিবদ্ধ অভিভাকত্ব) প্রতিষ্ঠা করা এবং বাংলাদেশ ও দেশের বাইরে দত্তক নেওয়ার উপযোগী, আইনগতভাবে স্বাধীন শিশুদের জন্মসনদ প্রদান করা। মিশনারিজ অব চ্যারিটির সুপিরিয়র সিস্টার মার্গারেট মেরি পরিত্যক্ত যুদ্ধশিশুদের ‘সংবিধিবদ্ধ অভিভাবক’ হিসেবে নিযুক্ত হন। ওই ঘোষণায় পরিত্যক্ত শিশু বলতে বোঝাবে যে, পরিত্যক্ত অথবা যাকে কেউ নিজের বলে দাবি করে না বা শিশু অবৈধ (যার জন্ম বিয়েবহিভর্‚ত)। আইনগতভাবে এসব শিশুর অভিভাবক হয়ে যায় সরকার।

তথ্য সূত্র: মুস্তাফা চৌধুরী, একাত্তরের যুদ্ধশিশু, এপিপিএল ও মুনতাসীর মামুন, বীরঙ্গনা সুবর্ণ

মন্তব্য করুন

যে মন্তব্যগুলো খবরের বিষয়বস্তুর সাথে মিল আছে এবং আপত্তিজনক হবে না সেই মন্তব্যগুলোই দেখানো হবে। প্রকাশিত মন্তগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত। পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য AZnewsbd কোন দায়ভার গ্রহণ করবে না।

জনপ্রিয়