বাংলাদেশ: সোমবার ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ
৫ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ১৩ই সফর, ১৪৪৩ হিজরি

  বাংলাদেশ: সোমবার ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ১৩ই সফর, ১৪৪৩ হিজরি  

শেষ আপডেটঃ ১:৫২ পিএম

সাতক্ষীরায় জটিল রোগের চিকিৎসা করে বিশ্ববিখ্যাত জ্বীন!

সাতক্ষীরায় নামের আগে ডাক্তার লাগিয়ে চিকিৎসার নামে প্রতারণার ফাঁদ তৈরী করে মানুষের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন রেজাউল ইসলাম ও কবিরাজ আকরাম হোসাইন নামক দুইজন ব্যক্তি। দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে আরোগ্য পাইয়ে দিতে বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়ে সাধারণ মানুষের সাথে তারা ব্যাপক প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছেন দীর্ঘদিন। অভিযুক্তদের একজন হলেন উপজেলার কৃষ্ণনগর এলাকার সামছুর রহমানের ছেলে হোমিও চিকিৎসক রেজাউল ইসলাম। অপরজন বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের হোগলা এলাকার মৃত সৈয়দ আলী গাজীর ছেলে কবিরাজ আকরাম হোসাইন।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, চিকিৎসার নামে এলাকার সহজ সরল সাধারণ মানুষের পরীক্ষার নামে প্রতারণার ফাঁদ পেতে ঘোষণা করে বড় বড় দুরারোগ্য ব্যাধির কথা। রোগী দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলে নিরাময়ের ওষুধও তার কাছে আছে জানিয়ে শুরু হয় প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আদায়।

কৃষ্ণনগর উপজেলার মৌতলা এলাকার বাসিন্দা নাসিমা ও ফাতেমা দুই বোন। তারা জানান, ভণ্ড চিকিৎসক রেজাউল ও কবিরাজ আকরাম হোসেনের প্রতারণার ফাঁদ ধরার জন্য পরিচয় গোপন রেখে রেজাউলের বাড়িতে যান।

তারা দেখেন, বাড়ির সামনে ডক্তার রেজাউলের বিরাট সাইনবোর্ড। সাইনবোর্ডে লেখা কম্পিউটারের মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করে জার্মানির ওষুধ দেওয়া হয়। রোগী এসেছে শুনে কথিত চিকিৎসক রেজাউল তার চেম্বারে বসিয়ে গভীর মনোযোগ সহকারে রোগী দেখছে। এরপর ডাক্তার হাতে একটি এনালাইজার মেশিন দিয়ে ল্যাপটপের সাহায্যে কিছু একটা দেখে তাদের নাকি লিভারে সমস্যা হয়েছে জানায়। রোগের কথা শোনার পর চিকিৎসা পদ্ধতি জানতে চাইলে ডাক্তার মুচকি হেসে জানায়, সমস্যা নেই। আমি এই রোগের চিকিৎসা করে দিলে সব সমাধান হবে যাবে। তবে আমার ভিজিট দিতে হবে ৩০০ টাকা, টেস্ট ১১শ’ টাকা আর ওষুধ ৪ হাজার টাকা।

রেজাউলের এ কথায় অনুসন্ধানী দুই বোন রাজি হয়ে গেলে ডাক্তার রেজাউল সন্দেহের নজরে তাকায়। এক পর্যায়ে তিনি উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। এরপর বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনের কর্তাদের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে প্রভাব বিস্তার করতে কথিত এইসএসসি পাস হোমিও ডাক্তার রেজাউল।

উপজেলার মথুরেশপুর ইউনিয়নের দুদলি গ্রামের আল আমিন কথিত ডাক্তার রেজাউল প্রতারণার স্বীকার হয়েছেন। তিনি বলেন, স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য রেজাউলের বাড়িতে যাই। প্রতারণার মাধ্যমে তার নিকট থেকে হাতিয়ে নিয়েছে মোটা অংকের টাকা। একই এলাকার সাবিনা খাতুন ও শফিকুল ইসলামের অভিযোগ তারাও ভুয়া ডাক্তারের প্রতারণার শিকার হয়েছেন।

বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের হোগলা গ্রামে সরেজমিনে দেখা যায় সেখানে চিকিৎসার নামে বেশ আয়োজন করেই পাতা হয়েছে প্রতারণার মহা ফাঁদ। হোগলা গ্রামের মৃত সৈয়দ আলী গাজীর ছেলে আকরাম গাজী। পড়ালেখা করেছেন মাত্র পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত। তিনি জিন-পরী দিয়ে রোগীদের বড় বড় রোগ অপারেশন করে থাকেন। ক্যান্সার, যৌনসমস্যা, সন্তান না হওয়া নারীদের সন্তান দান থেকে শুরু সব ধরণের চিকিৎসা করেন তিনি। আশ্চার্যজনক হলেও সত্য বিভিন্ন বড় বড় রোগের অপারেশন করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সার্জারি জিনেরা। এসব প্রতারণা করে রোগিদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে আকরাম হাতিয়ে নিয়েছে মোটা অংকের টাকা। যে সব নারীদের সন্তান হয় না তাদেরকে কবিরাজ আকরামের বাড়িতে রেখে চিকিৎসাও নাকি দিয়ে থাকে জিনের মাধ্যমে।

একই গ্রামের মহাদেব কুমার, শাহাজান হোসেন, তৌহিদ, জাকির হোসেনসহ একাধিক ব্যক্তি জানান, আকরাম নিজেকে জিনের বাদশা পরিচয় দিয়ে রোগী চিকিৎসা করেন। জার্মানি, ফরাসি ও চীন থেকে জিনের ডাক্তার এনে বিভিন্ন বড় বড় রোগের অপারেশন করার নামে তাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে মোটা অংকের টাকা বলে দাবি তাদের।

এ বিষয়ে আকরামের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি তৈল ও পানি পড়া দিয়ে থাকি। তবে এখন থেকে এসব কাজ আর করব না।

হোমিও চিকিৎসক রেজাউল ইসলাম জানান, তিনি হোমিও পদ্ধতিতে চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। তার পরীক্ষার যন্ত্রপাতি না থাকলেও রোগীদের মনোবল চাঙা রাখার জন্য পরীক্ষার কথা বলে থাকেন। ভুল স্বীকার করে আগামীতে তিনি এসব করবেন না বলে জানান।

এদিকে এ ব্যাপারে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শেখ তৈয়েবুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, জিনের দ্বারা অপারেশন এসবের কোনো ভিত্তি নেই। এ ছাড়া অনেকে নামের আগে ডাক্তার লিখে চিকিৎসা সেবার নামে সাধারণ মানুষের সাথে প্রতারণা করছে। যেটি খুবি দুঃখজনক। আমি সিভিল সার্জন স্যারের সাথে কথা বলে স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় এসব ভুয়া কবিরাজ ও চিকিৎসক নামধারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *